

আবদুল জলিল/ এনামুল হকঃ
শিক্ষাজয়ী সংগ্রামী নারী কামরুন নাহারের মা সেই ছোটবেলাই মারা যান। তার পিতা তখন ঢাকায় একটি পোষাক তৈরীর কারখানায় লেবার পদে কর্মরত ছিলেন। পিতার সামান্য আয়ে ছোট দুই ভাইকে নিয়ে ওই বয়সে সংসার চালাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। নিজের পড়ালেখার সাথে ছোট ভাইদের পড়ালেখার খরচ জোগানো তার পিতার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তদুপরি সংসারের নেই মায়ের আচলের ছায়া। এভাবে কিছুদিন চলার পরে তার পিতা আরেকটি বিয়ে করে সেই মাকে নিয়ে ঢাকায় থাকতে শুরু করেন। এই পরিস্থিতিতে কামরুন নাহারের মামা তাদের নিয়ে নিজ বাড়িতে আশ্রয় দেন। এদিকে তার পিতা সংসারের খরচ দেয়া এক প্রকার বন্ধ করে দেন। তাদের বাড়িতে এমন কোন সম্পদ ছিলো না যা বিক্রি করে তাদের সংসার চলে যাবে। এমতাবস্থায় ভাইবোনদেরসহ তার লেখা পড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়।
তার মামা এসব দেখে নিজের কাধে তাদের দায়িত্ব তুলে নেন। মামারও সংসার তেমন স্বচ্ছল নয়। অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া চালিয়ে যান কামরুন নাহার। মামার সহযোগিতার পাশাপাশি নিজে টিউশনি করে ভাইদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে থাকেন তিনি। ভাইদের পড়ালেখা করানোর চিন্তায় নিজেকে নিয়ে ভাববার খুব একটা সময় পাননি তিনি। এমনি করে ছোটবেলা থেকেই বাবা-মার ভালোবাসা বঞ্চিত কামরুন নাহার প্রতিকুল পরিবেশের সাথে লড়াই সংগ্রাম করে বেড়ে উঠতে থাকেন। পিতার পরিবার থেকে কোন প্রকার সহযোগিতা না পেয়ে মামার সহযোগিতা আর টিউশনী ও হাঁস-মুরগী, পালন করে বাড়তি কিছু অর্থ উপার্জন করে ভাইদের খরচ চালাতে থাকেন।
চারিদিকে শুধু হতাশার বেড়াজাল বাড়তে থাকলেও নিজে ছিলেন ভালো শিক্ষার্থী। তিনি বুঝতে শিখেছিলেন সংগ্রামের অপর নাম জীবন। তাই চরম হতাশার মধ্যেও আশার বাতি জ্বালিয়ে রেখে মনযোগ দিয়ে পড়ালেখা করে গেছেন।
এমনি করে তিনি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করেন। এরপর ডিপ্লোমা নাসিং পাশ করেন। এরপর তিনি নার্স এর চাকরি লাভ করেন। ২০২০ সালে সিনিয়র ষ্টাফ নার্স হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি কাজিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিনিয়র ষ্টাফ নার্স হিসাবে কর্মরত আছেন। এবছর এমএসসিতে পড়াশোনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।
এই প্রতিবেদককে কামরুন নাহার বলেন, “ আর্থিক সামর্থ্য না থাকলেও আমি হাল ছাড়িনি। ফলে আমি সফল হয়েছি। দুই ভাইকে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি নিজের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তন করেছি। হার না মেনে সবাইকে আমার মত নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আহবান জানাই। চেষ্টা করলে সফলতা আসবেই এটাই সত্যি। তাই কেউ হতাশ হবেন না।”
কাজিপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা চিত্রা রানী সাহা বলেন, “ প্রবল ইচ্ছাশক্তি, চেষ্টা এবং নিজস্ব চিন্তাশক্তি থাকলে হাজার দু:খ কষ্টকে পরাজিত করে জীবন – যুদ্ধে সফল হওয়া যায়। কামরুন নাহার তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ কারণে কামরুন নাহারকে “শিক্ষা ও চাকুরীর ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী” ক্যাটাগরিতে মনোনীত করে সম্মানিত করা হয়েছে। ”
এ/জে
আপনার মতামত লিখুন :