

আবদুল জলিল/এনামুল হক:
যমুনার ভাঙন জনপদের হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান দেলোয়ারা খাতুন। বাবা মা আর দুই বোনের সংসার। দারিদ্রের কষাঘাতে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও শৈশবেই পড়ালেখার পথ বন্ধ হয়ে যায় তার। তখনকার সমাজের রীতি অনুযায়ী পুতুল খেলার বয়সেই তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। প্রথম কিছুদিন শ্বশুরবাড়ীতে বেশ আদরেই সময় কাটে তার । কিন্তু ওই বাড়ির লোকজনের মোহ ভঙ্গ হতে সময় লাগে না। অকর্মা স্বামী আর শ্বাশুড়ীর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সমানতালে চলতে থাকে। প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। এরই মধ্যে দেলোয়ারার কোল জুড়ে আসে দুই কন্যা সন্তান। এর ফলে অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। একদিন স্বামীর প্রচন্ড মারে অচেতন হয়ে পড়েন তিনি।। জ্ঞান ফিরলে ২ শিশু সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাবার বাড়ীতে আশ্রয় নেন তিনি।
দিনমজুর স্বামীর সংসার ছেড়ে বাবার বাড়ীতে চলে আসার পর থেকেই একরাশ হতাশা দেলোয়ারাকে ঘিরে ধরে। দরিদ্র বাবার সংসারে বসে বসে দুই সন্তানকে নিয়ে খাওয়ার মতো অবস্থা ছিলো না। অনেক সময় পরিবারের লোকদেরকে না খেয়ে থাকতে হতো। তাই একটা কাজ খুঁজতে থাকেন তিনি। এরই এক পর্যায়ে কাজিপুর মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার অফিস থেকে ১ মাস মেয়াদী সেলাই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন । প্রশিক্ষণ শেষে নগদ ৯০০/- টাকা ও ৩০ কেজি গম পান। সেই থেকে শুরু দেলোয়ারার জীবন সংগ্রাম।
বাড়িতেই সেলাইয়ের কাজ করতে থাকেন তিনি। সেই সাথে কয়েকটি হাঁস-মুরগী ও ছাগল পালন শুরু করেন তিনি। এর ফলে তার হাতে আসে সংসার চালানোর মতো অর্থ। এমনি করে দিনের পর দিন পরিশ্রম করে বড় মেয়েকে স্নাতক এবং ছোট মেয়েকে এসএসসি পাসের পর বিয়ে দিয়েছেন। সেলাইয়ের কাজ করে তাদের লেখাপড়া এবং বিয়ের খরচ মিটিয়েছেন তিনি। নিজের রোজগারের টাকায় এক টুকরো জমি বন্ধক নেন তিনি। সেই জমির ফসল দিয়ে সংসারে খাবারের অভাব ঘুচেছে তার।
এরও কিছুদিন পরে টাকা জমিয়ে কিনেছেন একটি গরু। বর্তমানে এসব করে তার সংসার এখন পুর্বের চেয়ে আর্থিক ভাবে অনেক স্বচ্ছল। দেলোয়ারার এই জীবন সংগ্রামে একবারের জন্যেও তার স্বামী ফিরে তাকায়নি। নিজের বুদ্ধি আর পরিশ্রমের দ্বারা জীবনের গল্পটাকে দুঃখের বন্দর থেকে সুখের কিনারায় ভিড়াতে সক্ষম হয়েছেন দেলোয়ারা খাতুন।
তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, “ কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই বিয়ে, স্বামী, সন্তান এসবকিছু আমার জীবনে এসেছে। সেইসাথে দিনের পর দিন শুধু জুলুম অত্যাচার আর নির্যাতন সহ্য করেছি। কেউই এগিয়ে আসেনি তখন। একবার ভেবেছি মরেই যাবো। কিন্তু না। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে শুরু করি সেলাইয়ের কাজ। সকল বাধা উপেক্ষা করে চলতে থাকে আমার সংগ্রাম। আজ শুধুমাত্র পরিশ্রমের কারণেই পিছিয়ে পড়া এক গ্রাম্য নারী হতে সফলকামী নারীর দিকে ধাবিত হই। কাজের মাধ্যমে আমি নিজের অবস্থানের পরিবর্তন করতে পেরেছি।” নির্যাতিত নারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “ চুপ করে বসে না থেকে জীবন সংগ্রামে লড়াই করতে শিখুন। সফলতা আসবেই।”
কাজিপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা চিত্রা রানী সাহা বলেন, “ সমাজের নির্যাতিত অবহেলিত মা বোনরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। এখন সমাজের হাজারো দেলোয়ারারা ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন। সমাজের নির্যাতিত মা বোনরা যদি হতাশায় না ভুগে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সংগ্রাম করেন, তবে তারা দেলোয়ারার মতো সফল হবেন। পাশে আছে সরকারের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর।”
এ/জে
আপনার মতামত লিখুন :