

আহমেদ ফজলুর রহমান মুরাদ
জাসদ রাজনীতিকে আদর্শগত নির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজনে প্রণীত খসড়া থিসিসে বাংলাদেশকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক বলা হয় ও বিপ্লবের রূপ গণঅভ্যুত্থানমূলক বলে উল্লেখ করা হয়। পরিমার্জিত খসড়া থিসিসে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর– এ মূল্যায়ন ঠিক রেখে অসম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও জাতীয় করণীয় সমাপ্ত করতে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন এবং তা অর্জন করতে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশের পুঁজিবাদ অনুন্নত পুঁজিবাদ বলে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়।।
সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে বিপ্লবের প্রসঙ্গটি অবধারিতভাবেই এসে যায়। ধারাবাহিক সংগ্রামের এক নির্ধারক পর্যায়ে যখন নিপীড়িত শ্রেণি-গোষ্ঠী শোষক শ্রেণি-গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্যান্য সব শ্রেণি-গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়, তখন গণরায় ও যুক্তির কাছে হেরে গিয়ে শোষক শ্রেণি-গোষ্ঠী শক্তি প্রয়োগ করে নিপীড়িত জনতার জয় ঠেকাতে চায়। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজন হয় শোষক বাদে সব শ্রেণি-গোষ্ঠীর মিলিত গণজাগরণ-গণঅভ্যুত্থান, যার পরিণতিতে নতুন শ্রেণি-গোষ্ঠী ক্ষমতাসীন হয়, সেটাই হল বিপ্লব।
বিপ্লবের মাধ্যমেই চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। সে বিপ্লব কি ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বরের রুশ বিপ্লবের পুনরাবৃত্তি হবে? ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবরের চীন বিপ্লবের মতো হবে? ১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারির কিউবা বিপ্লবের মতো? ইতিহাস বলে কোনো ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটে না। আমাদের বাংলাদেশের সফল বিপ্লব (বা বিপ্লবী প্রচেষ্টা), গণঅভ্যুত্থানের উদাহরণ থেকে ভবিষ্যৎ বিপ্লবের রূপ ও করণীয় খুঁজতে হবে।
বর্তমান যুগে বিপ্লব শান্তিপূর্ণও হতে পারে। বাংলাদেশে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানের কাছে নতি স্বীকার করে স্বৈরশাসক এরশাদের বিদায় শান্তিপূর্ণ গণবিপ্লবের এক উদাহরণ। ২০০৮ নেপালে সমাজতন্ত্রী দলের দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের শেষ পর্যায়ে সব গণতান্ত্রিক ও সম্মিলিত নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণ গণঅভ্যুত্থানের পরিণতিতে রক্তপাতহীনভাবে রাজতন্ত্রের বিলোপ ঘটে, ‘আরব বসন্ত’-এর ঝাপটায় ২০১১ থেকে ধারাবাহিকভাবে তিউনিসিয়া, মিসর দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসকের পতন ঘটিয়েছে রক্তপাত ছাড়াই। আমাদের দেশের ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরিসমাপ্তি ঘটেছে হাজারো লাশের বিনিময়ে স্বৈরশাসকের পরাজয় ও পলায়নের মধ্যে দিয়ে।
ষাট-সত্তর-আশির দশকজুড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিপ্লবী আন্দোলন ও সশস্ত্র সংগ্রামের ঢেউ উঠেছিল। কোন কোন দেশে বিপ্লব ও মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছিল? বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, মোজাম্বিক, এঙ্গোলা, নিকারাগুয়াতে সশস্ত্র সংগ্রাম জয়ী হয়ে কোথাও জাতীয় স্বাধীনতা ও কোথাও সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যেসব দেশে সশস্ত্র লড়াই হয়েছিল, অথচ যুদ্ধের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ জয় পাওয়া যায়নি, তাদের অনেক দেশে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পথে রাজনৈতিক বিজয় (যেমন: দক্ষিণ আফ্রিকা, পূর্ব তিমুর, নেপাল) অর্জিত হয়েছে; আবার অন্য দেশে আলোচনার মাধ্যমে সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন ও ব্যক্তি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতে অংশ নিয়েছেন (যেমন: স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, চিলি, শ্রীলঙ্কা, সর্বশেষ কলোম্বিয়া)। কোনো কোনো বিপ্লবী দল ও নেতা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছেন। সব দেশেই একভাবে বিপ্লবী সংগ্রাম সফল হয়নি। বিপ্লবী আন্দোলনে যারা সফল হয়েছেন, তাদের প্রতিটি দেশই নিজস্ব ধারায় এগিয়েছে।সাম্প্রতিক ব্রাজিল, চিলি ও ডেনমার্ক তার প্রমাণ।।
আরেকটি জরুরি প্রশ্ন। এখনকার বিশ্ব পরিস্থিতিতে গণঅভ্যুত্থান হলেই কি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল পরিবর্তন ঘটবে? সমাজতান্ত্রিক শক্তি তথা প্রগতিশীল শক্তি জনগণের চেতনার রাজনৈতিক রূপ অনুধাবন না করেই যদি অন্য কোনো শক্তির রাজনীতি-সংস্কৃতির জমিনে দাঁড়িয়ে গণঅভ্যুত্থান উৎসাহিত করেন বা উস্কে দেন, তাহলে কি গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল পরিবর্তন ঘটবে? ১৯৭৯ সালে ইরানের বিপ্লব, ২০১১ সাল থেকে চলে আসা ‘আরব বসন্ত’ নামের আরব বিপ্লব কী ধরনের অভিজ্ঞতা দিয়েছে আমাদের?
বিশ্ব পরিস্থিতিতে সঠিক নেতৃত্বের অনুপস্থিতির কারণে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণেও গণঅভ্যুত্থানের সফলতা বা সফল হবার পরে তাকে টিকিয়ে রাখার কাজটি অনেক জটিল হয়ে পড়েছে। বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ নিজের পক্ষে না এনে সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। জনগণকে আদর্শগতভাবে সজ্জিত না করে শুধুমাত্র বিদ্রোহ, গণঅভ্যুত্থানের ডাক দিলেই তা প্রগতিশীল পরিবর্তন নিয়ে আসবে না। উদাহরণ: ইরানের ইসলামী বিপ্লব, আরব বসন্ত। সে বিবেচনায় বাংলাদেশে এ মুহূর্তের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছাড়া যে কোনো ধরনের গণঅভ্যুত্থান উৎসাহ দেওয়া বা উস্কে দেওয়া উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।একারণে বর্তমান গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে দেশের সকল উদার, গনতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য প্রক্রিয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ জাসদসহ অন্যান্য বাম,প্রগতিশীল গনতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে সঠিক ও কার্যকর কর্মকৌশল ও তার তাত্ত্বিক যুক্তি সন্ধানে ব্যস্ত। এ জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ। দলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মতের পার্থক্য ও ঐক্যের দিকগুলো চিহ্নিত করে বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ করে নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। মতাদর্শগত সংগ্রামের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিকতা ও দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কেন্দ্রীকতা থাকতে হবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান মুরাদ।
সাবেক ছাত্র নেতা।
আপনার মতামত লিখুন :