[gtranslate]

সমাজ বিপ্লব, ও আশু করনীয়


প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২৫, ২০২৪, ৯:০০ পূর্বাহ্ন / ১২৬
সমাজ বিপ্লব, ও আশু করনীয়

আহমেদ ফজলুর রহমান মুরাদ

কেন এমনটা হলো। হওয়ার কথা তো ছিল অন্যরকম। একাত্তরে তো আমরা সপ্ন দেখেছিলাম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজের, যেখানে মানুষে মানুষে বৈষম্য থাকবে না; থাকবে অধিকার ও সুযোগের সমতা; ক্ষমতা কোনো একটি কেন্দ্রে পুঞ্জীভূত হয়ে স্বৈরাচারী রূপ পরিগ্রহ করবে না, ক্ষমতার পরিপূর্ণ বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে; সর্বস্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব থাকবে প্রতিষ্ঠিত; মানুষের নিরাপত্তার কোনো অভাব ঘটবে না, মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা সম্ভব হবে। তেমনটা কেন ঘটল না? উত্তর হচ্ছে, ঘটার জন্য প্রয়োজন ছিল যে সামাজিক বিপ্লবের, সেটি সম্ভব হয়নি; রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরেই সম্পর্ক সেই আগের মতোই রয়ে গেছে : রাজা ও প্রজার; ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীনের। মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনার কথা আমরা বলি, এবং জিজ্ঞাসিত হলে সংজ্ঞা দিতে পারি না, সেটা তো আসলে সমাজ বিপ্লবের চেতনা ভিন্ন অন্যকিছু নয়।

তা সামাজিক বিপ্লবটা কেন ঘটল না? ঘটল না, কারণ বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তি দেশে ছিল না। যুদ্ধের পরে ক্ষমতা চলে গেল জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়াদের হাতে, তারা সবাই ছিলেন এবং এখনও রয়েছেন, পুঁজিবাদে বিশ্বাসী- জ্ঞাতে অথবা অজ্ঞাতে; কেউ অধিক, কেউ কম। সমাজ বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অঙ্গীকার করেছিলেন যে বামপন্থিরা, তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেন। কেবল ছত্রভঙ্গ নয়, পরস্পরবিরোধীও হলেন।

যে তরুণদের চেতনায় সমাজ বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা টগবগ করছিল তারা পথ পেল না খুঁজে। বড় একটা অংশকে টেনে নিয়ে গেল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল; যার নেতারা জানতেন না ঠিক কী চান, এবং কোন পথে এগোবেন। হাজার হাজার তরুণকে তারা দাঁড় করিয়ে দিলেন রাষ্ট্রের মুখোমুখি। সুবিধা যা হওয়ার, রাষ্ট্রেরই হলো। তরুণরা চিহ্নিত হয়ে গেল। রাষ্ট্র এদের দমন করতে পারল। আবার এই তরুণরা যে বিপ্লবের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, সেটাও ঘটলনা। বিপ্লবপন্থি তরুণদের এভাবে জ্বলে ওঠা ও নিভে যাওয়াতে শাসকশ্রেণি রাষ্ট্রকে নিজেদের মতো চালনা করার ব্যাপারে অতিরিক্ত সুবিধা পেয়ে গেল।

মুক্তিযুদ্ধের পরপরই দেখা গেল মুক্তির সমষ্টিগত স্বপ্নটি ভেঙে গেছে এবং ভাঙা টুকরোগুলো নির্মমভাবে পদদলিত হচ্ছে। অতিদ্রুত সমষ্টিগত সব স্বপ্ন ব্যক্তিগত হয়ে গেল। যুদ্ধের সময় প্রত্যেকে ভেবেছে, দেশকে কী দেওয়া যায়। যুদ্ধের পরে চিন্তাটা দাঁড়াল সম্পূর্ণ উল্টো- দেশের কাছ থেকে কতটা নেওয়া যায়। আমি কী পেলাম- এই জিজ্ঞাসাটা সরবে ও নীরবে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকল। সেই সঙ্গে- ও কেন অতটা পেল, আমি কেন এত কম পেলাম, সেই ঈর্ষাও লকলক করতে থাকল। ওই পরিণতির জালেই আমরা আটকে রয়েছি। সমাজ বিপ্লব ব্যতীত মুক্তির কোনো অবকাশ যে নেই; সেটাই অনিবার্য।।

বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোয় মধ্যবিত্তদের প্রভাব সুস্পষ্ট। এরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের প্রতিযোগী। এরা অসহিষ্ণু, অস্থির ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক।আবার গোষ্ঠীবাদিতার কারণে এরা মাঝে মধ্যে একে অপরের সহযোগী হয়। এই মধ্যবিত্তরা ছাড়াও সমাজের বাকি শ্রমজীবী-কর্মজীবী অংশ মধ্যবিত্ত মন-মানসিকতায় আচ্ছন্ন। এক কথায়বলা যায়,আমাদের গোটা জনগোষ্ঠী (শ্রমজীবী,কর্মজীবী, পেশাজীবি) পুরোপুরিভাবে মধ্যবিত্ত মনমানসিকতায় আচ্ছন্ন। শ্রম-কর্ম-পেশায়রত প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে কিছু সম্পত্তির মালিক হতে চায়।এখানে প্রত্যেকে অহেতুক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

প্রত্যেকেই নিজেকে অপরের সমকক্ষ করতে চায়। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থানের ক্ষেত্রে ‘চূড়ায়’ উঠতে চায়-কেন্দ্রবিন্দু হতে চায়। এসব আচরণের কারণে ‘মেকলে’ বাঙালিদেরকে নিচু জাতের মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু এই বর্ণনা সম্পূর্ণরূপে ভুল। গোটা জনসমষ্টির মন- মানসিকতায় যে সামাজিক -সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় তাকে নিচু জাতের বলে বর্ণনা করার অর্থই হলো সেই জনগোষ্ঠীর সমাজ-সংস্কৃতিকে না বুঝে কলঙ্কিত করা। বাঙালি জনগোষ্ঠীর এই যে সামাজিক -সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এটা তাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য। এই জাতীয় বৈশিষ্ট্যকে হিসেবে ধরেই জনগণের রাজনৈতিক -অর্থনৈতিক, সামাজিক -সাংস্কৃতিক ভবিষ্যতকে পরিচালিত করতে হবে।

মার্ক্সবাদের পুজি-শ্রম তত্ত্বের মালিক -দাসের দন্ধ এখন মালিক -কর্মচারী সম্পর্কে রুপ নিয়েছে। বর্তমানে এই শ্রমিক কর্মচারী রুপান্তর এক নুতন পেশাজীবি শ্রেণির জন্ম দিয়েছে যারা মুলত সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। মার্ক্সিজমের দাস শ্রেণির বা সর্বহারা প্রতিলিয়েত বিলুপ্ত হয়ে এখন এই নুতন পেশাজীবি কর্মজীবী শ্রেণির বিকাশ সমাজ বিপ্লবের সাথে যুক্ত হয়েছে।। এদেরকে প্রিটোরিয়া শ্রেণির শক্তি বলেও বিবেচনা করা যায়। গার্মেন্টস শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র চাকরিজীবি,বিভিন্ন সংস্থার শ্রমিক কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়ন এর অন্তর্ভুক্ত।। এরা সবাই মুলত নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে।। এদের রাষ্ট্র ক্ষমতার অংশীদার দাবি করে রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারলে এদেরকে আন্দোলনের অংশ করা সম্ভব।। কর্পোরেট ভোগবাদী পুজিবাদকে রুখতে এরাই এখন মূখ্য ভুমিকা নির্ধারক।।

রাজনীতির প্রয়োজন স্বাধীনতার অপূরণীয় তিন মন্ত্র- গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায় বিচার ও সাম্য প্রতিষ্ঠার চাহিদার মধ্যে in built বলা যায়….!! আজকের গণতন্ত্রহীনতা, সাম্প্রদায়িক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে বিজ্ঞানভিত্তিক কৌশলের ভিত্তিতে শ্রমজীবী-পেশাজীবীর রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা খুবই সময়োপযোগি চাহিদা। এই কর্মসূচিকে একটি আন্দোলনমুখী কর্মসূচি হিসেবে নিয়ে তা বাস্তবায়নে আগের সকল ভুল-ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরির জন্য সকল পর্যায়ে ডায়ালগ শুরু করতে হবে।। আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র ক্ষমতা ও আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুন্ঠন থেকে জাতিকে রক্ষার জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচির চাহিদাকে আরো ব্যাপকভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।। কোন বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের সাথে ক্ষমতার জন্য আপোষ বা দলীয় লেজুড়বৃত্তি করে নয় জাসদের নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েই ক্ষমতার পালাবদল এর জন্য লড়াই করতে হবে।।

বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের শেষ আশ্রয়স্থল তার আমলাগোষ্টি। আজকে আমাদের দেশের বুর্জোয়া রাজনীতির দেউলিয়াপনার কারনে রাষ্ট্র ব্যবস্থা পুরোপুরিভাবে আমলাগোষ্টির দখলে।সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে দেশের আমলাতন্ত্র এখন বেপরোয়া। তারা রাষ্ট্র ক্ষমতাকে প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ও লুটপাটে মগ্ন।দেশের বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তাদের দুর্নীতির চিত্র ও যে লুটপাটের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে সেটা একপ্রকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা।আর একারণেই দেশে সংঘটিত হয়ে গেছে এক ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান।

এই গনজাগরণের মাধ্যমে ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থানকে সফল করতে চাই একটি সফল পার্টি। আর‘একটি সফল পার্টি গড়ে তুলতে হলে আন্দোলনের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা কর্মী ও নেতাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে পার্টি গড়ার জন্য দরকারঃ ১। পরীক্ষিত কর্মী ও নেতাদের গনতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতায় বিশ্বাস ২। জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে ব্যাপ্ত করে চিন্তার একতা গড়ে তুলে আদর্শগত কেন্দ্রিকতা কায়েম। ৩। একই কায়দায় চিন্তা করার পদ্ধতি। ৪। কার্য পদ্ধতির মধ্যে ঐক্য এবং ৫। একগুচ্ছ পেশাদার বিপ্লবী।

‘আমাদের মত শোষণমূলক একটি সমাজে কেবলমাত্র একটি সমাজ বিপ্লবই স্থিতিশীলতা ও উন্নতির নিশ্চয়তা বিধান করতে পারে। যার পরবর্তীতে গড়ে উঠবে একটি শোষণহীন সমাজ। শ্রেণী ও পেশাজীবি গ্রুপ প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি সমাজ বিপ্লবের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বস্তুতঃ যখন সামাজিক শক্তিগুলো ‘নীচের দিক থেকে’ ঘনীভূত হতে থাকে তখন সেই শক্তিগুলোকে জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত হতে সহায়তা করার জন্য ‘উপর থেকে’ পরিচালিত ক্রিয়াকর্মের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। প্রস্তাবিত এই শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা এক্ষেত্রে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করতে পারে। ‘

বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলো সম্ভাব্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিতে পারবে না। কারণ এতে পেশাজীবীদের নেতৃত্ব নেই। দলের নেতৃত্বে তা না থাকলে দল রাজনৈতিক সুবিধাভোগ নেতৃত্বের কব্জাগত হয়ে পড়ে। বর্তমানে দোশের কোন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে পেশাজীবীদের সমন্বয় ঘটেনি। অবশ্যই কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। বর্তমান সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায়ে যত প্রকার কাঠামোগত বিন্যাস আছে তার পরিবর্তন করতে হবে। সমাজবিপ্লবে সনাতনী চিন্তা সর্বহারা বা শ্রমিক শ্রেণীর এক নায়কতন্ত্রের বিকল্প হিসাবে সমাজের নুতন এই পেশাজীবী কর্মজীবী ও শ্রমজীবী শ্রেণীর উত্থানের কথা চিন্তায় আনতে হবে।

সমাজশক্তির সকল শ্রেণী ও পেশার যৌথ আন্দোলন ও অবশেষে বুর্জোয়া রাষ্ট্র শক্তির ও তার আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের পরাজয়বরণ থেকে রাজনৈতিক শিক্ষা নিতে পারি পুঁজিবাদ ও তার দোসর দুর্নীতিবাজ আমলাগোষ্টির বিরুদ্ধ পেশাজীবী শ্রেণীর ঐক্য অপরাপর প্রগতিশীল চেতনার জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি সফল সমাজ বিপ্লব ঘটাতে পারে।তাই সাম্প্রতিক ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান থেকে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য ও শ্রেণী পেশার গড়ে উঠা ঐক্য ও বিজয় আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির পাথেও হয়ে থাকবে।।আমাদের মনে রাখতে হবে ৭১ বা ৯০ এর জাগরণের ফসল আমরা ঘরে তুলতে পারিনি তাই ২০২৪ এর গনজাগরণকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।।
বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক।।

(বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান মুরাদ।
সাবেক ছাত্রলীগের নেতা ও বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।।)