

একেএম ফজলুল হক মনোয়ার
আমার ধারনা গ্রাম বাংলার বাঙ্গালীদের কাছে রেডিও’র পরিচিতি ঘটে ষাটের দশকের প্রথম দিকে। আমরা যখন ছোট তখন মাইক এবং কলের গান বেশ জনপ্রিয় ছিল, মাইকে বা কলের গানে যখন গান বাজতো তখন পাড়ার মানুষ ওখানে গিয়ে হাজির হতো তারা এটাকে আশ্চর্য কিছু মনে করতো। ঐ সময়ের সম্পদশালীদের বাড়িতে কলের গান থাকতো। সিরাজগঞ্জ থেকে কাজিপুরের সোনামুখী পর্যন্ত ইছামতি নদী দিয়ে বেশ কয়েক মাস লঞ্চ চলতো, লঞ্চে থাকতো মাইক, সেই মাইক থেকে যখন গান ভেসে আসতো তখন নদীর পাড়ে উৎসুক জনতার এক অপরূপ দৃশ্য দেখা যেতো।
সকালে সোনামুখী ঘাট থেকে ছেড়ে যেতো সিরাজগঞ্জের উদ্দেশ্য আবার বিকেলে ফিরতো। বিকেল হলেই নদীর দিকে নজর থাকতো লঞ্চ দেখতে এবং গান শুনতে। এরপর ধীরে ধীরে রেডিও’র আগমন ঘটলো বিলাশী ও সম্পদশালীর কাছে হয়ে উঠলো রেডিও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। এরপর ১৯৬৫ সনের হিন্দুস্হান/পাকিস্তান যুদ্ধের সময় খবর শোনার জন্য অনেকের কাছে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে লাগলো। তখন মানুষের বিনোদনের জন্য ছিল যাত্রা পালা, সার্কাস এবং রেডিও। একপর্যায়ে রেডিও হয়ে ঊঠলে বিয়ের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপহার। বিয়েতে সাইকেল, ঘড়ি ও রেডিও না থাকলে অনেক বিয়ে ভেঙ্গে যেতো। নতুন জামাই শ্বশুরের দেওয়া রেডিও বাজাতে বাজাতে হেলে দুলে শ্বশুর বাড়ি যেতো, পাড়া প্রতিবেশীরা সে দৃশ্য দেখতো। রেডিও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠলো সত্তরের দিকে, বিনোদনের পাশাপাশি খবর শোনার আগ্রহ মানুষের মাঝে বাড়লো, সে কারণে, পাকিস্তান রেডিও (ঢাকা থেকে প্রচারিত), আকাশবানী কোলকাতা, গোহাটি এর পাশাপাশি বিবিসি এবং ভয়েস অব আমেরিকার খবর বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলো।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানুষ রেডিও’র কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়তো খবর শোনার জন্য। তখন অনেক পাড়াতে রেডিও থাকলেও থ্রি ব্যান্ড রেডিও ছাড়া বিবিসি ও ভয়েস অফ আমেরিকার খবর শোনা যেতো না, তাই খবর শোনার জন্য এক পাড়ার মানুষ অন্য পাড়ায় যেতো। স্বাধীনতার পরে ধীরে ধীরে রেডিও’র দাম মানুষের নাগালের ভিতর আসলো, চাহিদাও বেড়ে গেল। ষাট থেকে সত্তরের দশকে মহকুমা শহরগুলিতে দুই একটি সিনেমা হল গড়ে ঊঠে, গ্রামের মানুষ কোন প্রয়োজনে শহরে আসলে সিনেমা দেখার জন্য হলে ঘুড়তো, বিনোদনী মন নিয়ে সিনেমার গান আপন মনে গাইতে গাইতে গাইতে চলে আসতো। যুবকরা রেডিও’র বিজ্ঞাপনে জানার চেষ্টা করতো হলে কোন বই লেগেছে। আশির দশকে ডয়চে ভেলে, রেডিও পিকিং, রেডিও তেহরান মানুষের কাছে পরিচিতি পেলো। জাতীয় নির্বাচন শেষে ভোট গণনার সময় মানুষ রাত জেগে নির্বাচনের খবর শুনতো, খবরের সাথে থাকতো জনপ্রিয় নাটক মধুমালা, বেদের মেয়ে এবং জনপ্রিয় শিল্পী আব্দুল আলিম, আব্বাস উদ্দিন, রুনা লায়লা, নিনা হামিদ, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, আব্দুল জব্বারের মতো শিল্পীদের গান। আশির মাঝামাঝি ধীরে ধীরে গ্রামাঞ্চলে টেলিভিশনের আবির্ভাব ঘটে, তখন ব্যাটারি ছাড়া টিভি দেখা সম্ভব ছিল না, তাই রেডিও চাহিদা তখনও যতেষ্ট ছিল। যখন গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ আসা শুরু করলো তখন টেলিভিশন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলো, তবে টেলিভিশনে শুধু বাংলাদেশের চ্যানেল দেখা যাওয়ায় মানুষের খবর শোনার চাহিদা রেডিও’র মাধ্যমে পূরণ করতে হতো। নব্বই এর গণআন্দোলন পর্যন্ত নিরপেক্ষ খবরের জন্য রেডিওতেই মানুষের আস্থা ছিল। নব্বইয়ের মাঝামাঝি কিছু বেসরকারি টিভি চ্যানেল চালু হলে রেডিও’র চাহিদা কমতে থাকে। ধীরে ধীরে রেডিও চাহিদা কমতে থাকায় বিবিসি’র মতো প্রচার মাধ্যম বন্ধ হয়ে যায়। তবে দেশের আনাচে কানাচে এখনো রয়েছে রেডিও’র অনেক শ্রোতা।গড়ে উঠেছে রেডিও শ্রোতাদের সংগঠন। যারা এখনো রেডিও’কে মানুষের মাঝে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। জে/এ
এ কে এম ফজলুল হক মনোয়ার, সম্পাদক ও প্রকাশক ব-দ্বীপ বাংলাদেশ।

আপনার মতামত লিখুন :