

একেএম ফজলুল হক মনোয়ার-
১৯৫২ সনের পর থেকেই আমাদের এলাকায় পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন ব্যবস্থা নিয়ে এলাকার মানুষের ভিতর হতাশার সূত্রপাত হয়। কারণ পাশের পাড়ায় মনসুর আলী সাহেবের বাড়ি, তার সার্বক্ষণিক বিচরণ ছিল এই গ্রামে। লেখারপড়ার প্রাথমিক ধাপ এখানেই কেটেছে তার। এলাকার একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গান্ধাইল হাইস্কুল, পাঁচ মাইল দুরে মেঘাই হাইস্কুল আর দক্ষিণে প্রায় একই দুরত্বে বাগবাটি হাইস্কুল। চলাচলের জন্য বর্ষাকালে নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে পায়ে হেঁটে, সাইকেলে অথবা ঘোড়ায় চড়ে। পানি শুকিয়ে গেলে মানুষ হালোট বা খালের পার দিয়ে হেঁটে চলাচল করতো। ১৯৬৭ সনের দিক ওয়াপদার বাঁধ নির্মান হলে সিরাজগঞ্জ চলাচলের নতুন পথ সৃষ্টি হয়। এর আগে গান্ধাইল থেকে বালিঘুরঘুরি ভাটপিয়ারি হয়ে পায়ে হেঁটে/সাইকেলে অথবা ঘোড়ায় চড়ে, আর বর্ষা কালে একডালা থেকে লঞ্চে সিরাজগঞ্জ যাতায়াত করতো। গান্ধাইল হাইস্কুল, খেলার মাঠ, পোস্ট অফিস, সাবরেজিষ্ট্রি অফিস এবং খালের এপার ওপার চারদিন হাটবার থাকায় সব সময় জনসমাগম বেশী থাকতো। বিকেলে পোস্ট অফিস দিয়ে পেপার আসলে অনেকই পেপারে হুমড়ি খেতে পড়তো, যারা পড়তে পারতো না তারা শোনার জন্য পাশে বসতো।
১৯৬৯ সনের আইযুব বিরোধী আন্দোলনে এলাকার যারা সিরাজগঞ্জ বা বগুড়ার কলেজে পড়তো তারা এবং এলাকার শিক্ষক সমাজের অনেকেই কারণেই আন্দোলনের বিষয় বেশী জানাজানি হয় এবং এলাকার স্কুলের ছাত্ররাও আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। কাজিপুরের সন্তান আমির হোসেন ভূলু যিনি ছিলেন সারা সিরাজগঞ্জের ছাত্র সমাজের নেতা। বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকাকালীন সময়ে একটি শ্লোগান ছিল “আমির হোসেন ভুলু ভাই শেখ সাহেবের মুক্তি চাই।” ১৯৬৯ আন্দোলনের সময় গান্ধাইল স্কুল থেকে গান্ধাইল ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান বরইতার ঈমান আলী সাহেবের নিকট বিশাল বড় মিছিল নিয়ে যায়। তখন থেকেই মানুষ তাৎক্ষণিক সংবাদ জানার জন্য রেডিও পাশে এসে হাজির হতে শুরু করে। নিরপেক্ষ সংবাদের জন্য মানুষের আস্তায় আসে বিবিসি’র সংবাদ। থ্রি ব্যান্ড রেডিও ছাড়া বিবিসি’র সংবাদ শোনা সম্ভব হতো না, আর এই রেডিও তখন মানুষের ক্রয় ক্ষমতার ভিতর ছিল না, তাই যে বাড়িতে থ্রি ব্যান্ড রেডিও থাকতো সে বাড়িতে সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় সবাই দল বেঁধে হাজির হতো। ওয়ান ব্যান্ড রেডিও প্রতি পাড়ায় দুই চারটি করে ছিল, তাতে ঢাকা ও কোলকাতার সংবাদ শোনা যেতো কিন্তু তা মানুষের কাছে যথেষ্ট ছিল না। আইয়ুব খানের পতনের পর মানুষের ভিতর পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব বেশ চাঙ্গা হতে শুরু করলো, মাঝে মাঝে ছাত্র নেতারা গান্ধাইল আসলে তাদের কাছে দেশের অবস্থা জানার চেষ্টা করতো, ১৯৭০ সালের সম্ভবত মার্চ এপ্রিল মাসে মনসুর আলী সাহেব বাড়িতে আসলেন এবং রতনকান্দি হাটে প্রথম মিটিং করলেন। ১৯৭০ সনের ৭ ডিসেম্বর এবং ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন হলো, নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে মোতাহার হোসেন তালুকদার ও প্রাদেশিক পরিষদে মনসুর আলী সাহেব বিপুল ভোটে পাশ করেন। সিল দিয়ে প্রথম নির্বাচন চালু হওয়ায় মানুষের ভিতর ভোট প্রদানে সংশয় সৃষ্টি হলো নমুনা ব্যালোট পেপার ছেপে সীলসহ স্কুলের ছেলেদের বাড়ি বাড়ি পাঠানো হয়, ভোট দেওয়া শেখাতে, যার ফলে মানুষের ভোট প্রদানে তেমন অসুবিধা হয়নি। নির্বাচনের ফলাফল জানতে মানুষ রেডিও’র কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এই সময় থেকেই মানুষ বেশী বেশী বিবিসি ও ভয়েস অফ আমেরিকার খবর শুনতে শুরু করে। ২ মার্চের পর থেকে ঢাকা কেন্দ্রও ব্যাপক প্রচার শুরু করে। ২৫ মার্চের দুপুর পর্যন্ত যথারীতি বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান প্রচার হয়। ২৫ তারিখ রাত থেকে ঢাকাসহ সব কেন্দ্র (চট্টগ্রাম বাদে) পাকিস্তান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তখন মানুষ বাধ্য হয়ে বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা ও আকাশবানী কোলকাতাসহ আশেপাশের সেন্টারগুলির সংবাদ শুনতে। যুদ্ধ শুরু হলো মানুষের ভিতর ভয় আতঙ্ক আর সীমিত আশাও জাগলো স্বাধীনতা স্বপ্নে। যুদ্ধের প্রথম দিকে বাটবাটিতে হানা দিয়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তান আর্মি। এরপর কাজিপুর থানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় পাকিস্তান আর্মি। মানুষের মাঝে আতঙ্ক বাড়ে সন্ধ্যায় সবাই রেডিওর কাছে হাজির হয় পরিস্থিতি জানান জন্য। ধীরে ধীরে পাকবাহিনী এবং রাজাকার বাহিনী বিভিন্ন স্থানে হামলা লুটপার শুরু করে, আগষ্ট মাসে গান্ধাইল আক্রমণ করে এবং ৬ জনকে শহীদ করে। গ্রামে যুব সমাজকে মুক্তিযুদ্ধ যেতে মনসুর আলী সাহেবের বড় ভাগনে মোজাম্মেল হক সাহের, ময়েজ উদ্দিন আহমেদ স্যার, পিয়ার আলী স্যার, নুরুল ইসলাম তোতা ভাই, আমজাদ (যিনি শহীদ হয়েছেন) সহযোগিতা করেন। এরপর নভেম্বর মাসে রোজা দিনে মানুষ যখন সেহেরি খাচ্ছে এই সময় পাশের গ্রাম বরইতলায় শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। সারা গ্রাম পুড়ে দেওয়া হয়, শহীদ হন শতাধিক মানুষ, ইত্তেকাপে বসা মানুষদের মসজিদ থেকে বের করে এনে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। এতো কিছুর পরেও মানুষ আশাহত হয় নি, তারা যথা সময়ে রেডিও’র কাছে চলে আসতো খবরসহ, স্বাধীনতার পক্ষে চলা বিভিন্ন অনুষ্ঠান সংবাদ পর্যালোচনা ও চরমপত্র মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিল, বিশেষ করে চরমপত্র অনুষ্ঠানটি মানুষকে বেশী সাহস যোগাতো। পরিশেষে বলা যায় স্বাধীনতার ৯ মাস রেডিও বাঙালিদের দারুন ভাবে সহযোগিতা করেছে এবং যুদ্ধের পক্ষে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে সহযোগিতা করেছে। জে/এ
একেএম ফজলুল হক মনোয়ার, গান্ধাইল, কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :