[gtranslate]

বরগুনায় “মোগো রেডিও মোগো কতা কয়” স্লোগানে সম্প্রচারিত হচ্ছে লোক বেতার এফ এম-৯৯.২


প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ১০, ২০২৬, ৯:৫৯ পূর্বাহ্ন / ১৪৩
বরগুনায় “মোগো রেডিও মোগো কতা কয়” স্লোগানে সম্প্রচারিত হচ্ছে লোক বেতার এফ এম-৯৯.২

এম. জুলফিকার আলী ভূট্টো,
পাথরঘাটা, বরগুনা থেকে

কমিউনিটি রেডিও স্থানীয় জনগণের কন্ঠস্বর। এটি এক দিকে যেমন সাধারণ মানুষের তথ্যে অবাধ প্রবেশাধিকার তৈরী করছে, অন্য দিকে সরকারি ও বেসরকারি সেবা প্রাপ্তির ব্যাপারে জনগনের সচেতনতা বৃদ্ধি করছে। আর এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে গত ২৭ মে ২০১১ থেকে উপকূলীয় জেলা বরগুনাতে বাংলাদেশের প্রথম কমিউনিটি রেডিও লোক বেতারের যাত্রা শুরু হয়। (লাইসেন্স নং-০৩, ২৮ নভেম্বর, ২০১১)। বেতার কেন্দ্রের ঠিকানা- ৯৯, সদর রোড (পশ্চিম বরগুনা), বরগুনা-৮৭০০। স্থানীয় জনগণের আশা-আকাংখা ও চাহিদার সাথে সংগতি রেখে সংবাদ, বিনোদন, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, লোকজ সংস্কৃতি, আবহাওয়া সংবাদ, সচেতনতামূলক বার্তা, দৈনন্দিন বাজার দর, সরকারি-বেসরকারি তথ্য সেবা প্রাপ্তি, স্থানীয় সরকার কার্যক্রম ইত্যাদি অনুষ্ঠান নিয়মিত ভাবে সম্প্রচার করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিনোদন ও তথ্য ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে। দেশের দূর্যোগপূর্ণ দক্ষিণাঞ্চল প্রায়ই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকে, এমনকি একটানা তিন চার দিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকে। ফলে মানুষ নিয়মিত ভাবে টেলিভিশন দেখতে পারে না। এ ছাড়া প্রতিদিনের দৈনিক সংবাদপত্র পৌঁছে বিকেল ৩ টার পরে। জাতীয় গণমাধ্যমের পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় স্থানীয় জনগণের তথ্য ও বিনোদন প্রাপ্তির অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে কমিউনিটি রেডিও ‘লোক বেতার’।

লোক বেতারের সম্প্রচার সময় বিকাল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। তবে সম্প্রচার কার্যক্রম ইতোমধ্যেই বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ২৫০ ওয়াট উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রান্সমিশন যন্ত্রের মাধ্যমে সম্প্রচার কার্যক্রম চলছে। বরগুনার সবকটি উপজেলায় যে কোন জায়গায় বসে এখন লোক বেতারের অনুষ্ঠান শোনা যাচ্ছে। বরগুনা জেলার বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী, বামনা, বেতাগী, পাথরঘাটা ছাড়াও পটুয়াখালীর সদর উপজেলা, কুয়াকাটা, কলাপাড়া, মির্জাগঞ্জ, গলাচিপা, রাঙাবালি, ঝালকাঠির কাঠালিয়া, রাজাপুর, নলছিটি, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়া ও বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলায় লোক বেতারের অনুষ্ঠান শোনা যায়। লোক বেতারের সম্প্রচার এলাকার মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ৩১,৭৮,৯৭৭ জন (২০১১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ি)। বর্তমানে লোক সংখ্যা বেড়ে ৩৫ লাখের মত হয়েছে। যাদের মধ্যে ১০ লাখেরও বেশী মানুষ কোন না কোন ভাবে লোক বেতারের অনুষ্ঠান শুনছেন। প্রতিদিন ৫ লাখের মত শ্রোতা নিয়মিত অনুষ্ঠান শুনে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের মাধ্যমে গত বছরের (২০১৪ খ্রী.) ২৭ মে লোক বেতারের একটি ওয়েবসাইট তৈরী করে দেয়া হয়েছে। প্রতি মাসে ১ লাখেরও বেশী শুভাকাঙ্খী লোক বেতার ওয়েবসাইট ভিজিট করেছেন। তাছাড়া প্রতিদিন ১ হাজারেরও বেশী শ্রোতা এসএমএস ও ফোনের মাধ্যমে লোক বেতারের অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশগ্রহণ করে থাকেন। লোক বেতারের ফেইসবুক, লিংকধিন ও টুইটারের মাধ্যমে অনেকে অনুষ্ঠান শোনেন।

কমিউনিটি রেডিও একটি নির্দিষ্ট এলাকার হওয়ার কারণে ওই এলাকার জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। যার ফলে তারা নিজেদের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা লোক বেতারের মাধ্যমে বলতে পারছেন। বরগুনার আভ্যন্তরীণ খবর যেমন আবহাওয়া সংবাদ, দূর্যোগকালীন প্রতি মূহুর্তের আবহাওয়ার বিশেষ বুলেটিন, নিজস্ব সাংস্কৃতিক কৃষ্টি কালচার, আঞ্চলিক গান, আঞ্চলিক ভাষায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচার যা জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় স্থান পায় না, কিন্তু লোক বেতার পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে তা প্রচার করে থাকে। ফলে দিন দিন লোক বেতার জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। লোক বেতারে প্রচারিত শিক্ষা, স্থাস্থ্য, কৃষি, নারী, স্থানীয় সরকার, জাতীয় ইস্যু ভিত্তিক অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় যা উক্ত কমিউনিটির লোকজন বিশেষ ভাবে উপকৃত হচ্ছে। লোক বেতারের স্টুডিও ও অন্যান্য তথ্য: ক. স্টুডিওর সংখ্যা: ১, আরও ১টি স্টুডিও নির্মাণাধীন খ. ট্র্যান্সমিটারের শক্তি:১০০ ওয়াট (নতুন আরও ১ টি ২৫০ ওয়াটের ট্রান্সমিটার ক্রয় করা হয়েছে) গ. কনসোল সংখ্যা: ৩, ঘ. কম্পিউটার সংখ্যা: ৯, ঙ. জেনারেটর সংখ্যা:১, চ. বাদ্যযন্ত্র: হারমুনিয়াম, ঢোল, তবলা। শ্রোতা ক্লাব-লোক বেতারের মোট শ্রোতা ক্লাব সংখ্যা হচ্ছে ৮০ টি। প্রতিটি শ্রোতা ক্লাবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন (১০ ব্যান্ড) রেডিও দেয়া হয়েছে। প্রতিটি ক্লাবে ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। লোক বেতারের সক্ষমতা: লোক বেতারের রয়েছে তিনটি ট্রান্সমিশন যন্ত্র। যে কারণে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ১ মিনিটের জন্যও সম্প্রচার বন্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই। বিদ্যুৎ চলে গেলেও তাদের রয়েছে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন আইপিএস ও জেনারেটর। বিগত ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের সময়ও তারা একটানা ৪ দিন বিদ্যুৎ না থাকা অবস্থায় আইপিএস ও জেনারেটরের মাধ্যমে সারা দিন-রাত সম্প্রচার চালিয়েছি। তাদের রয়েছে দক্ষ জনবল। সেই সাথে রয়েছে ৩০৭ জন স্বেচ্ছাসেবক। পুরুষ ১৫৩ ও নারী ১৫৪ জন। যাদের অংশগ্রহণে মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান তৈরী করা তাদের কাছে সামান্য সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাদের রয়েছে নিজস্ব গীতিকার ও শিল্পী। যে কোন বিষয়বস্তু নিয়ে তারা গান লিখে ও সুর করে নতুন গান তৈরী করতে পারে। তাদের রয়েছে নাট্যকার ও অভিনেতা। লোকো বেতারের আছে একটি মানসম্পন্ন স্টুডিও। বিষয় ভিত্তিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান তৈরী করা তাদের কাছে কষ্টের কোন ব্যাপার নয়। লোক বেতারের পরিচালক মনির হোসেন কামাল বলেন-কন্ঠহীনের কন্ঠস্বর হিসেবে লোক বেতার জনমানুষের কথা বলে। উপকূলের কৃষি, স্বাস্থ্য, শিশু অধিকার, নারী অধিকার, শিক্ষা, মানবাধিকার, উন্নয়নসহ সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান করা হয়। প্রতিদিন শ্রোতাদের অংশগ্রহণে লাইভ অনুষ্ঠান করা হয়। আবহাওয়া বার্তাসহ প্রত্যেক দিন জনসচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হয়। প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে শ্রোতাদের চাহিদা পূরণ করা হয়।

লোক বেতার সম্পর্কে বলছিলেন বিশিষ্ট বেতার শ্রোতা এবং
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচী (সিপিপি)’র , পাথরঘাটার রায়হানপুর ইউনিয়নের ডেপুটি ইউনিয়ন টিম লিডার মো. মামুন হাওলাদার, উপকূলীয় জেলা বরগুনায় বাংলাদেশের প্রথম কমিউনিটি রেডিও লোক বেতার যাত্রা শুরু হয়। কমিউনিটি রেডিও স্থানীয় জনগণের কন্ঠস্বর। যাহা একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের তথ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার তৈরী করে এবং সরকারী বেসরকারী সেবা প্রাপ্তির ব্যাপারে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করে। লোক বেতার আমার জানামতে সম্ভাব্য ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে। লোক বেতার (Lokobetar) ৯৯.২ MHz বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় কমিউনিটি রেডিও স্টেশন, যা প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রোতাকে সরাসরি এস, এম, এস টেলিফোন, ফেসবুক এবং ইউটিউব এর মাধ্যমে যুক্ত করে। যাহা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তথ্য ও বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। লোক বেতার সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে তথ্য অ্যাক্সেস প্রদানের জন্য নিবেদিত করা, সরকারী ও বেসরকারী পরিষেবাগুলি অ্যাক্সেস করার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে লোক বেতার জনগণ এবং প্রয়োজনীয় সম্পদের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করে, স্থানীয় জনগণকে ক্ষমতায়ন ও শিক্ষিত করার চেষ্টা করে, তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করার জন্য একটি প্লাটফর্ম দেওয়া, তাদের গল্প শেয়ার করে এবং একে অপরের সাথে সংযোগ তৈরী করে। লোক বেতারের বিভিন্ন অনুষ্ঠান আমি শুনে থাকি যেমন, প্রতি ঘন্টার সংবাদ, স্থানীয় সংবাদ, সচেতনতা মূলক নাটিকা, রাতের আটা, রসালো আড্ডাসহ সকল অনুষ্ঠান আমাদের ভালো লাগে। বিশেষ করে আমাদের আঞ্চলিক সংবাদ আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে। সত্যি কথা বলতে সকল অনুষ্ঠান আমার কাছে প্রিয়। আমাদের উপকুলীয় এলাকার জন্য রেডিও অতি প্রয়োজনীয় একটি গণমাধ্যম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন চলাকালীন সময়ে কোন মাধ্যম যখন সচল থাকে না তখন বেতার যন্ত্র বিপদের বন্ধু হিসেবে আমাদের পাশে থাকে। কারণ তখন বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলে মোবাইল, টেলিভিশন অচল হয়ে যায়। তখন আমাদের বেতার যন্ত্রকেই বেছে নিতে হয়। আমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচী (সি.পি.পি) এর ডেপুটি ইউনিয়ন টিম লিডার হিসেবে দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করে আসছি, দূর্যোগ কালীন সময়ে আমরা আমাদের নিজস্ব ওয়ারলেজ এর মাধ্যমে সংবাদ পেলেও বেতারের মাধ্যমেই তাৎক্ষনিক সঠিক সংবাদ পেয়ে থাকি এবং সেই মোতাবেক আমরা জনসাধারণকে সতর্ক করে থাকি।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগ ও তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে, বরগুনার লোক বেতারের প্রতি একটু সদয় দৃষ্টি দেওয়ার যেন, লোক বেতারে অধিবেশনের সময় সীমা বৃদ্ধির জন্য প্রযোজনীয় সহযোগিতা করা। লোক বেতারের পরিচালনায় দায়িত্বে থাকা জনাব মো. মনির হোসেন কামাল ভাইয়ের একার পক্ষে লোক বেতার পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য। আমার অনুরোধ থাকবে। বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগ ও তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রণায় কর্তৃক অর্থ, সরঞ্জাম প্রদান সাপেক্ষে সার্বিক সহযোগিতা করা। জে/এ