[gtranslate]

লেখক: আকবর হায়দার কিরণ ৩৬ বছরে ‘ঠিকানা’ প্রবাসের এক অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস


প্রকাশের সময় : এপ্রিল ৬, ২০২৬, ৮:১২ পূর্বাহ্ন / ৫৩
লেখক: আকবর হায়দার কিরণ ৩৬ বছরে ‘ঠিকানা’ প্রবাসের এক অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস

এম আব্দুর রাজ্জাক, স্টাফ রিপোর্টার-

নিউইয়র্কে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘ঠিকানা’ আজ ৩৬ বছরে পদার্পণ করেছে। গতকাল সন্ধ্যায় ওয়ার্ল্ডস ফেয়ার মেরিনায় অনুষ্ঠিত হ’ল এ উপলক্ষে এক প্রাণবন্ত আয়োজন। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম নিহার সিদ্দিকী ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের এক সাথে এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়াও যেন স্মৃতির আরেকটি নতুন অধ্যায়। আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন এম. এম. শাহীন। প্রায় সাড়ে তিন যুগ আগে প্রবাসে একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করা ছিল এক দুঃসাহসিক উদ্যোগ। ‘ঠিকানা’-র প্রথম সংখ্যা ছিল ২৪ পৃষ্ঠার-যা সেই সময়ে নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। ঘটনাক্রমে আমিও যুক্ত হয়ে যাই ‘ঠিকানা’ পরিবারের সঙ্গে, বাংলাদেশ সংবাদদাতা হিসেবে। সেই সময়ে হাতে লিখে ফ্যাক্স করে লেখা পাঠানো ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।

একদিন বাংলাদেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ আমাকে বলেছিলেন-‘ঠিকানা’ পত্রিকায় তুমি ভালোই লিখছো।” এমন একটি মন্তব্য তখন আমার জন্য ছিল বিরাট প্রাপ্তি। ডেইলি নিউজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমি নিয়মিত লিখেছি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় কূটনীতি বিষয়ক কলাম। পাশাপাশি কাজ করেছি বিবিসির স্ট্রিংগার হিসেবে এবং লস এঞ্জেলেস ভিত্তিক ‘ভয়েস অব বাংলাদেশ’-এর প্রতিনিধি হিসেবে। এরশাদের পতনের পর ঢাকায় আসেন এম. এম. শাহীন। আমাদের বাসায় তিনি এসে ছিলেন কয়েক প্যাকেট মিষ্টি নিয়ে। তাঁকে ঘিরে ঢাকায় একটি বিশেষ অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়। তাঁর অনুরোধে ‘ঠিকানা’-র জন্য আমি বিশেষ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়ার। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ধারণকৃত সেই সাক্ষাৎকার ‘ঠিকানা’-য় প্রকাশিত হয় এবং পরে কৌশিক আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’ বেতার অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়। গুলশানে কর্নেল মোস্তাফিজের বাসায় বেগম জিয়ার সাক্ষাৎকার নিতে আমি গিয়েছিলাম জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে ফটো সাংবাদিক নুরু ভাইয়ের মোটর সাইকেলে চড়ে আজও সেই স্মৃতি অমলিন। বছরের পর বছর ‘ঠিকানা’-র বার্ষিক আয়োজনে অংশ নিয়েছি। সাঈদুর রব ভাইয়ের সঙ্গে এক সাথে ভয়েস অব আমেরিকার ৫০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া, বাংলা টিভির জনপ্রিয় ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের শুরু থেকে সম্পৃক্ত থাকা এসবই যেন এই দীর্ঘ পথচলার উজ্জ্বল অধ্যায়। তবে এবারের অনুষ্ঠানে অনুভূতিটা ছিল ভিন্ন-মনে হচ্ছিল জীবনের অর্ধেকটা যেন কেটে গেছে এই ‘ঠিকানা’-কে ঘিরেই, এই নিউইয়র্ক শহরে। শাহীন ভাই মাঝে মধ্যে দেশের টানে বাংলাদেশে ফিরে গেছেন, এমনকি দুইবার জাতীয় সংসদের সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু ‘ঠিকানা’-র প্রতি তাঁর ভালোবাসায় কখনো ভাটা পড়েনি। তাঁর বড় ভাই, জাতীয় ক্রীড়াবিদ সাঈদুর রব বহু বছর ‘ঠিকানা’-র সম্পাদক হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন তিনি অবসর নিয়ে কুলাউড়ায় একটি বিশাল মিউজিয়াম গড়ে তোলার কাজে ব্যস্ত।

সময়ের স্রোতে বদলে গেছে অনেক কিছু। শাহীন ভাইয়ের ছোট্ট মেয়ে আনুভা-যাকে আমরা আদর করে ‘আনুভা মামনি’ বলতাম-আজ ‘ঠিকানা’-র সিইও। এই প্রবাসে জন্ম নেওয়া মেয়েটি নাকি এখনো “কিরন আংকেল”-এর লেখা পড়ে আবেগাপ্লুত হয়! আনুভা, তুমি আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের গর্ব। অনুষ্ঠানের সেই জনসমাগম যেন এক ভিন্ন জগত। বিশাল হল জুড়ে পরিচিত মুখ, আলিঙ্গন, করমর্দন, ছবি তোলা সব মিলিয়ে এক উচ্ছ্বসিত পরিবেশ। হঠাৎই এক মুরুব্বি এসে জড়িয়ে ধরলেন-চিনতে একটু সময় লাগলেও বুঝলাম, তিনি সেই পরিচিত শামসুল হক ভাই। দীর্ঘদিন পর অনেকের সঙ্গে দেখা অনেক স্মৃতি ফিরে এলো। করোনাকালে ব্রেইন স্ট্রোকসহ নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজও বেঁচে আছি হয়তো সবার দোয়া ও ভালোবাসায়। অনুষ্ঠানে নতুন প্রজন্মের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। মীর শিবলী মামু ও শারমিন রেজা ইভা আপুর মেয়ে রুপন্তী যার জন্মের পর প্রথম ছবি তুলেছিলাম আমি-আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, হাতে ক্যামেরা নিয়ে কাজ করছে ‘ঠিকানা’-র অনুষ্ঠানে। প্রকৃতির নিয়মে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি সময়ের অন্য প্রান্তে, আর নতুন প্রজন্ম বড় হয়ে নিচ্ছে আমাদের জায়গা। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে পৃথিবী বদলে যাচ্ছে দ্রুত। কিন্তু ‘ঠিকানা’ যেন তার নিজস্ব চিরন্তন রূপে, প্রবাসী জীবনের স্মৃতি ও ইতিহাস বুকে নিয়ে বহমান থাকে-এই প্রত্যাশাই রইলো। সময়ের স্রোতে মানুষ বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়-কিন্তু কিছু সম্পর্ক, কিছু প্রতিষ্ঠান, কিছু স্মৃতি থেকে যায় চিরকাল। ‘ঠিকানা’ শুধু একটি পত্রিকা নয়, এটি প্রবাসী বাঙালির হৃদয়ের ঠিকানা। জে/এ